,

সহায়-সম্বল হারিয়ে সর্বস্বান্ত নদী পাড়ের মানুষ

শাহারিয়ার রহমান রকি, ঝিনাইদহ: ঝিনাইদহে গড়াই নদীর ভাঙনে সহায়-সম্বল হারিয়ে সর্বস্বান্ত হয়ে পড়েছেন নদী পাড়ের মানুষ। রাজনৈতিক নেতাকর্মী, পানি উন্নয়ন বোর্ড কিংবা প্রশাসনের কাছ থেকে মেলে শুধুই ভাঙন প্রতিরোধের আশ্বাস। কিন্তু পরিবর্তন হয় না গড়াই পাড়ের ভাঙন কবলিত মানুষের ভাগ্যের।

গড়াই নদী ঝিনাইদহের শৈলকূপা অংশে প্রায় ২২ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে প্রবাহিত। উপজেলার নদী তীরবর্তী বড়ুলিয়া, কৃষ্ণনগর, নলখোলাসহ বেশ কয়েকটি গ্রামে প্রতি বছর নদীর পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভাঙন শুরু হয় আর পানি কমার সঙ্গে সঙ্গে তা ভয়াবহ আকার ধারণ করে। কয়েক বছরের ভাঙনে বড়ুলিয়া গ্রামের প্রায় ৯০ ভাগই নদীতে বিলীন হয়েছে।

রাতারাতি বদলে যায় গ্রাম ও মানুষের ভাগ্যের চিত্র। চলতি বছরে অনেক মানুষ ঘর-বাড়ি হারিয়েছেন আবার অনেক বাড়ি ঘর হারানোর হুমকিতেও রয়েছেন। ভাঙন থেকে রক্ষা পাচ্ছে না মসজিদ, মন্দির, কবর স্থান কিংবা শ্মশান ঘাট ও ফসলি জমি।

জানা যায়, ২০১৪-১৫ সালে জরুরি কাজের জন্য দুই দফায় দেড় কোটি টাকা বরাদ্দ আসে। তা দিয়ে  শুধুমাত্র বাঁশের বেড়া তৈরি ও কিছু বালুর ব্যাগ ফেলার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে জরুরি কাজ। পানি বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ওই বছরে নদী গর্ভে বিলীন হয়।

এরপর আর ভাঙন রোধে কোনো কাজ করা হয়নি। স্থানীয় সংসদ সদস্য, পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো), প্রশাসনিক কর্মকর্তারা এরপর নানা সময়ে ভাঙন কবলিত এলাকা পরিদর্শন করেছেন। দিয়েছেন রোধের আশ্বাস কিন্তু তা বাস্তবে রূপায়িত হয়নি।

বড়ুলিয়া গ্রামের গৃহবধূ রাশিদা বেগম জানান, আমাদের প্রায় আট বিঘা জমি ছিল। তা নদীতে তলিয়ে গেছে। এখন একটু দূরে তিন কাঠা জমির ওপর কোনো রকমে স্বামী-সন্তান নিয়ে বাস করছি। তাও হয়তো তলিয়ে যেতে পারে নদীতে। রাতে আমাদের ঘুম হয় না। সব সময়ই ভয়ে থাকি। হঠাৎ ভয়ে চমকে উঠি।

ভাঙন কবলিত এলাকার অন্যান্যরা জানান, আমাদের কারো কারো বাড়ির উঠানে ফাটল দেখা দিয়েছে। আর নদীর যে স্রোতের তীব্রতা তাতে মনে হয় না এ বছর বাড়িতে থাকতে পারব। কারণ পানি কমলে ভাঙন আরও ভয়াবহ রূপ নেবে।

১৯৯০ সালের পর থেকেই ভাঙন চলছে। এখন আরও বেশি হচ্ছে। গেল কয়েক বছরে অনেকেই এলাকা ছেড়েছে। তবে বেশির ভাগই পার্শ্ববর্তী রাস্তা কিংবা অন্যের জায়গায় আশ্রয় নিয়েছে। গ্রামের অধিকাংশ মানুষই সব হারিয়ে নিঃস্ব প্রায়। কেউ কামলার কাজ করে, কেউ বা ভ্যান চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করে।

স্থানীয় সারুটিয়া ইউপি চেয়ারম্যান মাহমুদুল হাসান মামুন জানান, ওই সময় (২০১৪ ও ২০১৫ সালে) সরকারের কাছ থেকে বড় প্রকল্প আনার জন্য হালকা কিছু কাজ করা হয়েছিল। যাতে এটি দেখিয়ে বড় কাজ করা যায়। তবে পানি উন্নয়ন বোর্ড ভাঙন রোধে কাজ করে না বলেই জনগণের কাছে আমাদের হেনস্তা হতে হয়, তারা ভাবে আমরা খেয়ে ফেলেছি। আসলে এসব অভিযোগ ঠিক না।

শৈলকূপা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম জানান, পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে, তাদের পরামর্শে অর্থ বরাদ্দ প্রাপ্তি সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

গড়াই নদীর ভাঙন কবলিত এই অংশের দায়িত্বরত পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ সহকারী প্রকৌশলী তৌফিক উজ জামান জানান, ভাঙন স্থায়ী প্রতিরোধে পানি উন্নয়ন বোর্ড ২৪২ কোটি টাকার প্রজেক্ট চলতি বছরের জুলাই মাসেই সাবমিট করেছে। তবে গড়াইয়ের শৈলকূপা অংশের জন্য আলাদা ১৮০ কোটি টাকার প্রস্তাবনা থাকায় এটি পাস হতে দেরি হচ্ছে। বিলটি অধিদপ্তর হয়ে একনেকে পাস হলেই কাজ শুরু হবে।

১৯৯০ সালে পর থেকে ভাঙনে পড়ে সাড়ে ৩ হাজার বিঘা জমি চলে গেছে কুষ্টিয়ার খোকসা উপজেলার ভেতর। অন্য জেলার ভেতর হওয়া এসব চরের দখলও নিতে পারছে না ভিটে হারা শৈলকূপা উপজেলার এ মানুষগুলো।

এই বিভাগের আরও খবর